মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা ইউরোপীয় অর্থনীতিকে কাবু করে রেখেছে। অঞ্চলটির ঐতিহ্যবাহী অটোমোবাইল শিল্প বিভিন্ন ধরনের টানাপড়েনে ধুঁকছে। সঙ্গে রয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতি। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফরাসি ও জার্মান রাজনীতির অস্থিরতা। সব মিলিয়ে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক মন্থরতা আরো সংকটে পড়তে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। খবর এপি।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইউরোভিত্তিক প্রায় অর্ধেক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ফ্রান্স ও জার্মানি। কিন্তু দেশ দুটির রাজনৈতিক অচলাবস্থা আগামী বছর বহাল থাকলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া দুরূহ হয়ে উঠবে।
গত সপ্তাহে আস্থা ভোটে পরাজিত হওয়ার পর পদত্যাগ করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ার। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করলেও তিনি সংসদে সংখ্যালঘুই থেকে যাবেন। সংবিধান অনুযায়ী দেশটিতে জুনের আগে নির্বাচন সম্ভব নয়। অন্যদিকে জার্মানিতে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক চ্যান্সেলর ওলাফ শুলজ নেতৃত্বাধীন জোট গত মাসে ভেঙে যাওয়ায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে আগাম নির্বাচন। দেশটিতে নতুন সরকার গঠন হতে এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সব মিলিয়ে একসময় যে ফ্রান্স-জার্মানি অক্ষ ইউরোপকে এগিয়ে নিয়ে যেত, সেখানে এখন শূন্যতা বিরাজ করছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতবা রহমান জানান, জার্মানির সম্ভাব্য নতুন চ্যান্সেলর ও কনজারভেটিভ নেতা ফ্রেডরিখ মার্জ উন্নয়ন বাবদ খরচ ও বিনিয়োগে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ শিথিল করতে আগ্রহী। কিন্তু ফ্রান্স অর্থনৈতিক ইস্যুতে ‘সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতের’ সম্মুখীন হতে পারে। কারণ আর্থিক কৌশল বাস্তবায়নে দেশটিতে যথেষ্ট রাজনৈতিক সমাধান নেই।
মুজতবা রহমান বলেন, ‘এ পরিস্থিতি পরিষ্কার অর্থে ইউরোপের জন্য সমস্যা। কারণ ফ্রান্স ও জার্মানি উভয়ই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজ করবে না।’
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সাবেক প্রধান মারিও দ্রাঘি সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে ইউরোপের পিছিয়ে পড়া ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর আলোকপাত করেন। পাবলিক বিনিয়োগে সাধারণ ঋণ, ইইউজুড়ে একক শিল্প নীতি এবং স্টার্টআপের জন্য আর্থিক বাজার একত্রীকরণের পরামর্শ দেন তিনি। বিষয়গুলো উল্লেখ করে মুজতবা রহমান বলেন, ‘ইউরোপে ফরাসি-জার্মান সমন্বয় ছাড়া কিছুই এগোতে পারে না।’
ফরাসি অর্থনীতিবিদ ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের গবেষণা প্রধান অ্যান-লর দেলাতের মতে, সতর্ক থাকলেও সামগ্রিকভাবে ফরাসি রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন নয় দেশটির আর্থিক বাজার। তবে ফ্রান্স ও জার্মানির অর্থনৈতিক দুর্বলতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বৃহত্তর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি ইউরোপের বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল করবে অথবা ভালো পারফর্ম করা নেদারল্যান্ডস বা স্পেনের মতো অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে স্থানীয় ক্ষমতা ও প্রভাব স্থানান্তরিত হবে।’
ফ্রান্স এ বছর ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে জার্মানির অর্থনীতিতে এ বছর দশমিক ১ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাসে রয়েছে। এটি টানা দ্বিতীয় বার্ষিক সংকোচন এবং আগামী বছর দশমিক ৭ শতাংশ পুনরুদ্ধারের আশা করছে। জার্মানি দক্ষ শ্রমিকের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ জ্বালানি খরচ নিয়ে সমস্যায় পড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখন সেই সমস্যাগুলোর সমাধান ঝুলে রয়েছে।
ইইউ-ভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য নিয়ে কাজ করেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়ন। সদস্য দেশগুলোর ওপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। তবে ফ্রান্স ও জার্মানির সমর্থন ছাড়া ভন ডার লিয়নের ক্ষমতা সীমিত।
আরো একটি আশঙ্কা হলো, ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর ইউরোপের বাণিজ্য বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমানে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা নতুন মার্কিন শুল্ক বা আমদানি কর নিয়ে সম্ভাব্য বাণিজ্য বিরোধ কমানোর চেষ্টা করছেন। ইউরোপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে না, এভাবে পারস্পরিক ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধমূলক যুদ্ধ এড়ানো যাবে। ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে ব্লকটি, অথবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় আরো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত কেউ একা নিতে পারবে না।
ইউরোপের কম প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মূল্যস্ফীতিপীড়িত ভোক্তারা খরচের ব্যাপারে খুবই সতর্ক। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, ইউরো ব্যবহারকারী ২০টি ইইউ সদস্য দেশের অর্থনীতি এ বছর দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
সরাসরি প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ছোট হলেও রাজনৈতিক স্থবিরতার কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে সংলাপের জন্য ইউরোপ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাচ্ছে। এমনটা মনে করেন বেরেনবার্গ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার শ্মিডিং।
তার মতে, যথাযথ হতো যদি ট্রাম্প ক্ষমতা নেয়ার আগে ইউরোপ একটি বড় ধরনের প্রস্তাব প্রস্তুত রাখে। যেমন বাণিজ্য ও ইউক্রেন বিষয়ে যদি ট্রাম্প শিথিল আচরণ করে তবে ইউরোপ প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এটি ঘটছে না।
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি হলো যে ট্রাম্প বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের ওপর আগের চেয়ে কঠোর হতে পারে। কারণ জার্মানি ও ফ্রান্স কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে না।’